সরকার এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সূত্র সমকালকে এসব তথ্য জানিয়েছে। সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করে ঐকমত্য কমিশন। প্রধান উপদেষ্টা এই কমিশনের সভাপতি। যমুনায় বৈঠকে তিন উপদেষ্টা এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাও ছিলেন।
সংসদের বাইরে সংবিধান সংশোধনকে অবৈধ মনে করে বিএনপি। তারা সাংবিধানিক আদেশের ঘোর বিরোধী। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল সংবিধানের সংস্কার ছাড়া সনদে সইয়ে রাজি নয়।
যমুনা এবং কমিশন সূত্র সমকালকে
জানিয়েছে, রাজনৈতিক ঐকমত্য না থাকায় নির্বাচনের আগে সনদ বাস্তবায়ন অনিশ্চিত। সনদ না হলে জামায়াতসহ কয়েকটি দল নির্বাচন বর্জন করবে। ফলে নিশ্চিতভাবেই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না। নির্বাচন না হলে রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিরতা দেখা দেবে, যা সামাল দেওয়া সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই নির্বাচনের স্বার্থে সনদ বাস্তবায়ন জরুরি। এ জন্য রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন। সমঝোতা না হলে সরকারকে সনদ বাস্তবায়নে শক্ত অবস্থান ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে– প্রশ্নে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ সমকালকে বলেছেন, সরকারপ্রধানকে পুরো পরিস্থিতি জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও মতামত, বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পরামর্শ সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।
সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি
নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গণভোট এবং সাংবিধানিক আদেশ নিয়েও কথা বলেছেন। প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন সামনে রেখে অবশ্যই মৌলিক সংস্কার চূড়ান্ত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। বৈঠকে উপস্থিত একজন উপদেষ্টা এবং ঐকমত্য কমিশন-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি সমকালকে জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সমঝোতা চেয়েছিলেন। সব দলের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কাজটি করে তিনি ভারসাম্য রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য সম্ভব নয়– তা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় প্রধান উপদেষ্টাকে শক্ত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি রাজি হয়েছেন। রোববার রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপে তিনিও যোগ দিতে পারেন। যদি সেখানে ঐকমত্য না হয়, তবে সরকার বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারির মাধ্যমে সংস্কার কার্যকরের পথে যেতে পারে।
বিএনপির আপত্তিই সরকারের জন্য বাধা
বিএনপি সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের বিরোধী। দলটির অবস্থান হলো, নির্বাচিত সংসদ ছাড়া কারও সংবিধানের পরিবর্তন আনার ক্ষমতা নেই। যেসব সংস্কারের জন্য সংবিধানে পরিবর্তন প্রয়োজন নেই, সেগুলো অধ্যাদেশে বা নির্বাহী আদেশে নির্বাচনের আগে বাস্তবায়ন করতে পারবে সরকার। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মতামতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মাধ্যমে সাংবিধানিক ধারবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকায়, সাংবিধানিক আদেশ জারির ক্ষমতা নেই বর্তমান সরকারের।
জামায়াতের ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকার ১০৬ অনুচ্ছেদ নয়, জনগণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গঠিত হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিতেই শেখ হাসিনার পতন হয় ৫ আগস্ট। পরের তিন দিন দেশে সরকার ছিল না। যা কিছু হয়েছে ওই সময়ে তা জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী হয়েছে। এই অভিপ্রায়েই সংবিধানে কোনো সুযোগ না থাকার পরও অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের সমকালকে বলেছেন,
বিদ্যমান সংবিধানে, সাংবিধানিক আদেশ জারির ক্ষমতা না দেওয়া হলেও জনগণের অভিপ্রায়ে তা হতে পারে। এই ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। সাংবিধানিক আদেশ জারিকে কেউ অবৈধ বললে তো সরকারও অবৈধ।
এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টিরও অবস্থান জামায়াতের কাছাকাছি। ঐকমত্য কমিশন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে দুই দফা বৈঠকে সনদ বাস্তবায়নে গণভোট ও সাংবিধানিক আদেশের পরামর্শ পেয়েছে। গণভোট আয়োজন জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা সাংবিধানিক আদেশকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। যমুনায় বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টাকে এটি জানানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা গত জুনে সংলাপে বলেছিলেন, সংস্কারের যেসব সুপারিশে ঐকমত্য হবে, সেগুলোই বাস্তবায়ন করা হবে। কিছু নির্বাচনের আগে এবং বাকিগুলো পরবর্তী সরকার বাস্তবায়ন করবে।


















