যেন টানটান উত্তেজনার কোনো থ্রিলার মুভি! কী ছিল না এই ম্যাচে? প্রথমার্ধেই ৪ গোল হজম করে ফ্রান্সের খাদের কিনারে চলে যাওয়া, দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের আভাস, লিওনেল মেসিকে টপকে কিলিয়ান এমবাপ্পের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়া আর বুকায়ো সাকার ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক। সব মিলিয়ে ১০ গোলের এক রোলারকোস্টার রাইড উপভোগ করলো ফুটবল বিশ্ব।
রোমাঞ্চে ভরপুর ২০২৬ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে ৬-৪ গোলের অবিশ্বাস্য ব্যবধানে হারিয়ে সান্ত্বনার জয় পেয়েছে ইংল্যান্ড।
সেমিফাইনালে হারের আক্ষেপটা যেন ফ্রান্সের ওপর দিয়েই মেটাতে চেয়েছিল ইংলিশরা।
ম্যাচের বাঁশি বাজতে না বাজতেই লিড নেয় তারা। সময় তখন মাত্র ২ মিনিট ১৪ সেকেন্ড।
ফরাসি মিডফিল্ডার মাইকেল ওলিসের এক ভুল পাসের সুযোগ নিয়ে দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটে গোল করেন ডেক্লান রাইস। এটি ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম গোল (দ্রুততম গোলটির রেকর্ডও ফ্রান্সের বিপক্ষে, ১৯৮২ বিশ্বকাপে ২৮ সেকেন্ডে ব্রায়ান রবসন)।
গোল হজম করে ফ্রান্স ধাতস্থ হওয়ার আগেই তাদের ওপর রীতিমতো টর্নেডো বইয়ে দেয় ইংল্যান্ড। ১৮ মিনিটে রাইসের নেওয়া কর্নার থেকে দারুণ হেডে ব্যবধান ২-০ করেন কনসা। বিশ্বকাপে এর আগে কখনোই এত দ্রুত ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার তেতো স্বাদ পায়নি ফরাসিরা। এর আগে ২০২২ ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩৬ মিনিটে দ্বিতীয় গোল খেয়েছিল তারা।
এরপর শুরু হয় বুকায়ো সাকা শো। ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইগনান বেশ কয়েকটি সেভ দিলেও, ৩৭ মিনিটে প্রতি আক্রমণ থেকে মার্কাস রাশফোর্ডের পাস থেকে অনায়াসে বল জালে জড়ান সাকা। আর প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে (৪৫+২ মিনিট) আবারও ফরাসি জালে বল পাঠিয়ে নিজের দ্বিতীয় ও দলের চতুর্থ গোলটি আদায় করে নেন আর্সেনালের এই তারকা। ১৯৫৮ সালের সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে ৫-২ গোলে হারের পর, এই প্রথমবার বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে চার গোল হজমের লজ্জায় পড়ে লে ব্লুসরা।
৪-০ ব্যবধানে পিছিয়ে বিরতিতে যাওয়া ফ্রান্স দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামে একাদশে চার পরিবর্তন নিয়ে। কোচ দিদিয়ের দেশমের এই কৌশল জাদুর মতো কাজ করে। ৪৮ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় উপামেকানোর বাড়ানো বল ধরে ওলিসে ক্রস দেন এমবাপ্পেকে। নিখুঁত প্লেসিং শটে ব্যবধান কমান ফরাসি অধিনায়ক। ৫৪ মিনিটে এমবাপ্পের অ্যাসিস্ট থেকে গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান ৪-২ করেন বারকোলা। দ্বিতীয়ার্ধের ৯ মিনিটের জোড়া গোলে ম্যাচে ফেরার জোরালো ইঙ্গিত দেয় ফ্রান্স।
এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ৬৭ মিনিটে ওলিসের দুর্দান্ত এক ফ্লিক থেকে বল পেয়ে বাঁ পায়ের শটে গোল করেন এমবাপ্পে। এই গোলে ব্যবধান ৪-৩-এ নেমে আসার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত এক মহাকাব্যিক রেকর্ড। এবারের আসরে নিজের ১০ম গোল করে লিওনেল মেসিকে (২১) ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (২২ গোল) হয়ে যান এমবাপ্পে! ১৯৭০ সালে গার্ড মুলারের পর এমবাপ্পেই প্রথম, যিনি এক বিশ্বকাপে ১০ গোলের মাইলফলক ছুঁলেন। অন্যদিকে, এই গোলে সহায়তা করে এবারের আসরে নিজের ৭ম অ্যাসিস্টটি করেন অলিসে, যা ১৯৭০ বিশ্বকাপের পর সর্বোচ্চ।
ফ্রান্সের একের পর এক আক্রমণে ইংল্যান্ডের ৪ গোলের লিড তখন রীতিমতো হুমকির মুখে। ঠিক তখনই পেনাল্টি পেয়ে যায় ইংল্যান্ড। সফল স্পটকিকে দলকে ৫-৩ ব্যবধানে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজের হ্যাটট্রিকও পূরণ করেন বুকায়ো সাকা। ১৯৬৬ সালের ফাইনালে জিওফ হার্স্টের পর সাকাই হলেন ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় খেলোয়াড়, যিনি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে হ্যাটট্রিক করলেন।
ম্যাচের নাটকীয়তা তখনও শেষ হয়নি। ৯০+৬ মিনিটে ইংলিশদের ভুল পাস থেকে বল পেয়ে ডি-বক্সের ভেতর দুই ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে গোল করেন ওসমান দেম্বেলে (৫-৪)। কিন্তু ফরাসিদের সমতায় ফেরার আশা পরের মিনিটেই (৯০+৭) শেষ করে দেন জুড বেলিংহ্যাম। দারুণ এক ফিনিশিংয়ে গোল করে ইংল্যান্ডের ৬-৪ ব্যবধানের বিশাল জয় নিশ্চিত করেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।
হার দিয়ে বিশ্বকাপ শেষ করলেও ব্যক্তিগত রেকর্ডে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন এমবাপ্পে। আর ফুটবল বিশ্ব মনে রাখবে শ্বাসরুদ্ধকর এই ১০ গোলের থ্রিলার ম্যাচটি!
/টিটি

















