শেরপুর: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্থগিতকৃত শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণ শেষে এখন গণনা চলছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটারদের ভিড় দেখা যায়। এর মধ্যে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল বেশি। দীর্ঘদিন পর ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পেরে তাদের মধ্যে আনন্দ বিরাজ করছিল। কিন্তু উল্টো ছিল দুপুরের চিত্র। দুপুরের সময় অনেক কেন্দ্র ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখা যায়। শ্রীবরদী হাইস্কুল মাঠে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে গিয়ে ইট পাটকেলের আঘাতে দুইজন পুলিশ সদস্য আহত হয়।
দুপুরের দিকে জামায়াত প্রার্থী মাসুদুর রহমান বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে জাল ভোট, ভোট কারচুপি, বিভিন্ন অনিয়ম এবং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।
মাসুদুর রহমান বলেন, বিভিন্ন কেন্দ্রে জালভোট দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি কেন্দ্র থেকে আমার এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে। আগে থেকে অভিযোগের পরেও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।
সংবাদ সম্মেলনের পর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নানা অনিয়মের কথা তুলে ধরেন। সেগুলো তুলে ধরা হলো:
খড়িয়াকাজির চর ইউনিয়নের লঙ্গরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ২য় তলায় উত্তর লঙ্গরপাড়া পুরুষ বুথের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার মো. খায়রুল আলম ভোটার উপস্থিত হওয়ার পূর্বে ব্যালটের পিছনে একাধিক সিল ও স্বাক্ষর করে রাখেন।
লঙ্গরপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি বুথের ব্যালটগুলোতে পূর্ব থেকে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারগণ ব্যালটে সিল ও স্বাক্ষর করে রেখেছেন। বিষয়টি বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোরশেদ আলমকে অবহিত করলে তিনি বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেন এবং সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারগণ অন্যায় করেছেন বলে স্বীকার করেন ও তাদেরকে এ ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ দেন। জামায়াত প্রার্থীকে তিনি পরবর্তীতে ব্যালেট আর কোনও সিল মারা হবেনা বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মামদামারী দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে বিএনপি নেতা কাজী আবু তাহের ভোটারদেরকে প্রকাশ্যে সিল মারতে বাধ্য করেন। এ বিষয়ে জামায়াতের পোলিং সাইফুল মালেক বিরত থাকতে বললে এক পর্যায়ে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে এই কেন্দ্রে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাসুদুর রহমান উপস্থিত হয়ে প্রত্যেকটি বুথের ব্যালেটের অপর পার্শ্বে সিল ও স্বাক্ষর করার বিষয়টি অবহিত করলে তারা ভুল স্বীকার করেন।
শ্রীবরদী ইসলামিয়া কামিলা মাদ্রাসা কেন্দ্রে শ্রীবরদী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন দুলাল, শ্রীবরদী পৌর বিএনপির আহ্বায়ক ফজলুল হক চৌধুরী অকুল, শ্রীবরদী পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক শোভন শাহরিয়ার রাফি, বিএনপি নেতা প্রণব, সাবেক ছাত্রদল নেতা রাজু, সাবেক ছাত্রদল নেতা জিয়াউল সহ বিএনপি নেতা কর্মীরা প্রত্যেক বুথ দখল করে ভোটারদেরকে প্রকাশ্যে সিল মারতে বাধ্য করেন। শ্রীবরদী পৌর জামায়াতের প্রচার সম্পাদক ও জামায়াতের এমপি প্রার্থী মাসুদুর রহমানের ভাগিনা আস সাদিক (মিতুল) কে নির্বাচনের পরের দিন বাড়ি থেকে তুলে আনার হুমকি দেন, ভয়ভীতি দেখান ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন । কেন্দ্র থেকে পোলিং এজেন্টদেরকে বের করে দেন, প্রকাশ্যে ব্যালট ছিনতাই করে সিল মারতে থাকেন। সামগ্রিক বিষয়ে শ্রীবরদী উপজেলা যুব বিভাগের সভাপতি আমীর হামযা মিস্টার প্রশাসনকে অবহিত করতে গেলে প্রশাসনের সামনে শ্রীবরদী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও শ্রীবরদী পৌর বিএনপির আহ্বায়ক ফজলুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপির নেতা কর্মীরা তার ওপর অতর্কিত হামলা করে মারাত্মকভাবে আহত ও জখম করেন । বর্তমানে জামায়াত নেতা আমীর হামযা মিস্টার শেরপুর সরকারী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
শ্রীবরদী সরকারী কলেজ কেন্দ্রে জামায়াতের ভোটার স্লিপ বিতরণের সময় শ্রীবরদী উপজেলা সাবেক আহ্বায়ক জুবাইদুল ইসলাম রাজনের নেতৃত্বে প্রায় এক থেকে দেড়শ জন বিএনপি নেতা কর্মীরা জামায়াত কর্মীদের হাতে সরকারী কলেজ কেন্দ্র থেকে জামায়াতের এজেন্টদেরকে বের করে দেয়া হয়। থাকা ভোটার তালিকা, সিল্প, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র জোড়পূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে যায় ও ভয় ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
ঝগড়ারচর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়ার সময় জামায়াত প্রার্থী মাসুদুর রহমান এক বিএনপি কর্মীকে জাল ভোট প্রদান করা হয়েছে। হাতেনাতে আটক করে প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে হস্তান্তর করেন। সকাল থেকেই ঝগড়ারচর কেন্দ্রে ব্যাপক কর্মীদের অযাচিত আনাগোনা দেখা যায় । ঝগড়ারচর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও একই অবস্থা বিরাজমান।
ভেলুয়া ইউনিয়নের শিমুলচুড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপি নেতা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল করিমের নেতৃত্বে জামায়াত প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদেরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে বুথ কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়। বিষয়টি প্রিজাইডিং অফিসার হুমায়ুন কবির জুয়েলকে অবহিত করা হলে কোনও প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
শ্রীবরদী আকবরিয়া পাবলিক পাইলট ইনস্টিটিউশন কেন্দ্রে শ্রীবরদী পৌর বিএনপির সদস্য সচিব এসএম সোহান, পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শহীদুল্লাহ কায়সার নেতৃত্বে জাল ভোট প্রদান করা হয়। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের এজেন্টদেরকে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে বুথ থেকে বের করে দেয়া হয় ।
খড়িয়া কাজির চর ইউনিয়নের পোড়াগড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধানের শীষের এজেন্ট মোছা. রোজিনা বেগম নিজ হাতে ভোটারদের ব্যালটে সিল দিয়ে ব্যালট বক্সে ফেলেন। প্রিজাইডিং অফিসার আবুল কালাম আজাদকে বিষয়টি অবহিত করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।
শ্রীবরদী সদর ইউনিয়নের উত্তর শ্রীবরদী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জামায়াত কর্মীদের উপর হামলা ও মারধর করা হয়।
কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের গড়খোলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে জামায়াত এজেন্টদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে বুথ থেকে বের করে দেয়া হয়। এ ব্যাপারে প্রিজাইডিং অফিসার ও প্রশাসনকে অবহিত করেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
ঝিনাইগাতি উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের আয়নাপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপি নেতা কর্মীরা জাল ভোটা দিতে থাকলে তাদেরকে আটক করা হলে জামায়াতের এজেন্টদের উপর সংঘবদ্ধ হামলা চালায়। জামায়াতের এজেন্ট তাজুল ইসলামকে ব্যাপক মারধর করে মারাত্মকভাবে আহত ও জখম করে।
ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের গান্ধীগাও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঝিনাইগাতী উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি শহীদ মাওলানা রেজাউল করিম হত্যা মামলার আসামী আরেফিন সোহাগ সহ কয়েকজন বিএনপি নেতার নেতৃত্বে জালভোট প্রদান ও প্রকাশ্যে সিল মারা হয় ।
এদিকে বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কোন কেন্দ্রেই সিলমারা বা এজেন্ট বের করে দেয়ার মত ঘটনা ঘটে নাই। এমন কোন ছবি বা ভিডিও ফুটেজ কেউ দেখাতে পারবেনা। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তার বলয় তৈরি করছিল তা নজিরবিহীন। আমরা আরো দুই-তিনদিন আগেই জানতে পেরেছিলাম নির্বাচনের দিন জামায়াত দুপুর ১ টার দিকে ভোট বর্জন করবে।
শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচনে এবার বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাসুদুর রহমান মাসুদ (দাঁড়িপাল্লা) এবং বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান (কাঁচি) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
জেলা নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, শেরপুর-৩ আসনে ভোটার ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন। দুটি উপজেলায় ১৭ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনে ১২৮টি ভোটকেন্দ্র ছিল। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫ হাজার এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৮ হাজার ৩০৪ জন। হিজড়া ভোটার ছিল সাত জন।
/কেকে/এসএফ


















