১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ২৭শে ভাদ্র, ১৪৩৩

শেরপুর-৩ উপনির্বাচন: হারানো দুর্গ উদ্ধারে মরিয়া বিএনপি, ভাগ বসাতে চায় জামায়াত

প্রতিবেদক
নিউজ এডিশন ডেস্ক
এপ্রিল ৮, ২০২৬ ৬:৪৭ অপরাহ্ণ

শেরপুর: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্থগিত হওয়া শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে হারানো দুর্গ উদ্ধারে মরিয়া বিএনপি। অন্যদিকে, এ আসনের মাটিতে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের আমির এবং এ আসনের পূর্বের প্রার্থী মরহুম নুরুজ্জামান বাদল এবং শহীদ রেজাউল করিমের রক্তের দাগ লেগে আছে। সেই রক্তের বদলা নিতে মরহুম নুরুজ্জামান বাদলের ভাই মাসুদুর রহমান মাসুদ জামায়াতের মনোয়ন নিয়ে আসনটিতে ভাগ বসিয়েছেন। আসনটিতে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির ভোটের লড়াইটা জমে উঠবে বলে জানিয়েছেন ভোটাররা।

আগামী ৯ এপ্রিল আসনটিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। শেষ সময়ের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন প্রার্থীরা। সভা সমাবেশ সহ ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এলাকার উন্নয়নে তারা নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইছেন। তুলে ধরছেন নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নির্বাচনী  অঙ্গীকার। মাইকিং স্লোগান ও ছোট ছোট পথসভায় সরব থাকছে নির্বাচনী এলাকা যা গভীর রাত পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এ আসনের নির্বাচনে এবার বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল(ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাসুদুর রহমান মাসুদ (দাঁড়িপাল্লা) এবং বাসদ (মার্কসবাদী) দলের প্রার্থী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান (কাঁচি) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এক সময়ের বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এ আসনটির হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে এবার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে বিএনপির প্রার্থী তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল। দীর্ঘ দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এ আসনটি পুনরুদ্ধারে পারিবারিক কৌশলী প্রচারণায় সরগরম হয়ে উঠেছে দুই উপজেলার জনপদ। তবে এ চড়াই-উতরাইয়ের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাসুদুর রহমান মাসুদ।

 ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন বিএনপি’র প্রার্থী ডা. সেরাজুল হক। ১৯৯৪ সালের ২৮ অক্টোবর তার মৃত্যুর পর ১৯৯৫  সালে উপনির্বাচনের মাধ্যমে এমপি নির্বাচিত হন তার বড় সন্তান মাহমুদুল হক রুবেল। এরপর রুবেল বিএনপি’র প্রার্থী হয়ে ১৯৯৬ সালের    ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন।

এবারের নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্য অর্জনে বিশাল নারী ভোটব্যাংক দখলে নিতে বিএনপি প্রার্থীর স্ত্রী ফরিদা হক দিপা এবং মেয়ে রুবাইদা হক রিমঝিম প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাড়ায়-পাড়ায় উঠান বৈঠক করছেন। আর অস্ট্রেলিয়ায় পড়ুয়া ছেলে রাফিদুল হক শিক্ষিত ও তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। পারিবারিক এ বিশেষ প্রচারণা সাধারণ ভোটার এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। 

অন্যদিকে শক্ত অবস্থানে মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ও শেরপুর জেলা জামায়াতের ব্যবসায়িক শাখা ‘ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টস অ্যান্ড বিজনেসমেন ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদুর রহমান মাসুদ। তিনি জামায়াত নেতা মরহুম মুহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদলের ছোট ভাই। নির্বাচনে তিনি বড় ভাইয়ের ইমেজ ও পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন।  

ভোটাররা জানান, এ আসনে জয়ের পথ কোনো প্রার্থীর জন্য সহজ নয়। এখানে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। জামায়াতের  রয়েছে সুসংগঠিত কর্মীবাহিনী এবং নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক। যেটি বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলের জন্য কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছে।

এ আসনটি বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত হলেও জামায়াত প্রার্থী জয়ের বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প নিয়েই প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বহুজন রুবেলকে ‘পরীক্ষিত এমপি’ মনে করছেন। তাদের মতে বর্তমান বিএনপির সরকার থাকায় রুবেল এমপি হলে এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ বেশি পাওয়া সম্ভব। জামায়াত সমর্থকরা মনে করেন, মাসুদ হলেন জামায়াত নেতা মরহুম মুহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদলের উত্তরসূরী। এ আসনে তার বড় ভাই যেমন জনপ্রিয় ছিলেন তিনিও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন।

বিএনপি’র প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বন্যা ও করোনার দুর্যোগে আমি সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে ছিলাম। শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীর প্রতিটি পাড়া-মহল্লা আমার চেনা। কোথায় কী সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা- সবই আমার জানা। জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী। শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীর মানুষ বরাবরের মতোই পাশে থেকে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করবে। নির্বাচনে বিজয়ী হলে এলাকায় উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখবো।  

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেন, এ আসনটি তার মরহুম বড় ভাইয়ের গড়ে তোলা। এখানকার ভোটাররা এখন সচেতন, পুরোনো রাজনৈতিক বক্তব্যে তারা প্রভাবিত হবেন না। মানুষ চাঁদাবাজ ও অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্তি চায় এবং জামায়াতকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখছে। নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে তিনি শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমার বিশ্বাস, ভোটাররা আমাকে জয়ী করবেন। কারণ,আমার বড় ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী হবে মডেল এবং গ্রীণ উপজেলা। আমিও সে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছি।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায়, আর এ ধারাকেই সামনে নিয়ে আমি প্রার্থী হয়েছি। আমার বিশ্বাস মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবে। আমি জয়ী হলে এ আসনের সমস্যা সমাধানে কাজ করবো। পাশাপাশি মানুষের যে ন্যায্য দাবি সেগুলো বাস্তবায়ন করবো।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, শেরপুর-৩ আসনে ভোটার ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন। দুটি উপজেলায় ১৭ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনে ১২৮টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে গারো পাহাড়ি এলাকার ৩২টি কেন্দ্রকে দুর্গম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, শেরপুর-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদল গত ৩ ফেব্রুয়ারি মারা যাওয়ায় এ আসনের নির্বাচন প্রথমে স্থগিত ও পরে বাতিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। পরে আগামী ৯ এপ্রিল এ আসনের নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন ধার্য করে নতুন করে তফসিল ঘোষণা করা হয়।

/এসএফ

সর্বশেষ - লাইফস্টাইল