২৭শে জুলাই, ২০২৬ | ১২ই শ্রাবণ, ১৪৩৩

পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধে ভারতের প্রভাব কী?

প্রতিবেদক
নিউজ এডিশন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬ ৪:৫২ পূর্বাহ্ণ

ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈরিতার মধ্যে আফগানিস্তানের তালেবানদেরকে ভারতের “প্রক্সি” হিসেবে কাজ করার অভিযোগ করেছে পাকিস্তান।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) কাবুলে পাকিস্তানি বাহিনীর বোমা হামলার কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক্সে লেখেন, ২০২১ সালের জুলাইয়ে আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের পর আশা করা হয়েছিল, আফগানিস্তানে শান্তি বিরাজ করবে এবং তালেবানরা আফগান জনগণের স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার দিকে মনোনিবেশ করবে, কিন্তু তালেবানরা আফগানিস্তানকে ভারতের উপনিবেশে পরিণত করেছে। তিনি তালেবানদের বিরুদ্ধে “সন্ত্রাসবাদ রপ্তানির” অভিযোগ করেন।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার জন্য পাকিস্তান সরাসরি এবং বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মাধ্যমে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। ব্যাপক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। তবে, তালেবানরা ভারতের প্রক্সি হয়ে উঠেছে।

এ পর্যয়ে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আফগানিস্তানের সঙ্গে “উন্মুক্ত যুদ্ধ” ঘোষণা করেন।

খাজা আসিফ আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনায় ভারতকে টেনে আনার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। গত অক্টোবরে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে একটি কম তীব্রতার যুদ্ধে জড়াতে চায়। এটি অর্জনের জন্য তারা কাবুলকে ব্যবহার করছে।

এখন পর্যন্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী আসিফ তার দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। আফগানিস্তানের তালেবানরা ভারতের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ভারত অবশ্য আফগানিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশটি তালেবানদের আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।

ভারত ও তালেবানের মধ্যে সম্পর্ক কীভাবে বিকশিত হয়েছে?

১৯৯৬ সালে যখন তালেবানরা প্রথম আফগানিস্তানে ক্ষমতায় আসে, তখন ভারত তাদের প্রতি বৈরী নীতি গ্রহণ করেছিল এবং তাদের ক্ষমতা গ্রহণকে স্বীকৃতি দেয়নি। ভারত তালেবানের সঙ্গে সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্কও ত্যাগ করেছিল। সেই সময় নয়াদিল্লি তালেবানকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রক্সি হিসেবে দেখত। তখন তালেবান প্রশাসনকে স্বীকৃতি দেওয়া একমাত্র তিনটি দেশ ছিল—-পাকিস্তান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

এরপর ২০০১ সালে ভারত আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আক্রমণকে সমর্থন করে। ওই আক্রমণে তালেবান প্রশাসনের পতন ঘটে। এরপর ভারত কাবুলে তাদের দূতাবাস পুনরায় চালু করে এবং হামিদ কারজাইয়ের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে স্বাগত জানায়। এর প্রতিক্রিয়ায় তালেবানরা আফগানিস্তানে ভারতীয় দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোতে আক্রমণ করে। ২০০৮ সালে কাবুলে ভারতের দূতাবাসে তালেবানদের বোমা হামলায় কমপক্ষে ৫৮ জন নিহত হন।

২০২১ সালে তালেবানরা আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসার পর, ভারত আফগানিস্তানে তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দেয় এবং দেশটির তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু এক বছর পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবানদের মধ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পাকিস্তান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আফগানিস্তান আশ্রয় দেয় বলে অভিযোগ তোলে। এ সময় ভারত তালেবানদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে।

২০২২ সালে ভারত কাবুলে তাদের মিশন পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞদের একটি দল পাঠায় এবং গত অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানের রাজধানীতে দেশটির দূতাবাস পুনরায় চালু করে। এ ছাড়া গত দুই বছরে ভারত ও আফগানিস্তানের কর্মকর্তারা বিদেশে, কাবুল এবং নয়াদিল্লিতে বৈঠক করেছেন। কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি ভারত তালেবান শাসনামলে আফগানিস্তানকে মানবিক সহায়তাও দিয়েছে।

ভারত আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে কেন?

২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর যখন তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরে আসে, তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মূলত আশা করেছিলেন, পাকিস্তান তালেবান প্রশাসনকে আফগানিস্তানের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু সম্পর্ক বৈরি হয়ে ওঠে, পাকিস্তান বারবার তালেবানদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান তালেবানের (টিটিপি) মতো পাকিস্তানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আফগান মাটি থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করার অনুমতি দেওয়ার অভিযোগ করে। তালেবানরা তা অস্বীকার করে। এরপর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান হাজার হাজার আফগান শরণার্থীকে বহিষ্কার করলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়।

এদিকে, ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের সঙ্গে যে সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছিল তা বজায় রাখার জন্য ভারত শেষ পর্যন্ত তালেবানদের প্রতি একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে এবং পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে দুর্বল সম্পর্ককে কিছুটা হলেও কাজে লাগায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্তি বলেন, আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েনের ঘটনা ‘শত্রুর শত্রু’ যুক্তিটি কাবুল ও নয়াদিল্লির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরিতে আঠা হিসেবে কাজ করছে।

ভারত ও পাকিস্তান ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র পহেলগামে সশস্ত্র হামলায় ভারতীয় পর্যটকদের হত্যার পর চার দিনের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আফগানিস্তান এ সময় পহেলগাম হামলার তীব্র নিন্দা করার সুযোগ নেয় এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তালেবানদের প্রতি “গভীর কৃতজ্ঞতা” প্রকাশ করে।

ভারতও আফগানিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক পদক্ষেপের নিন্দা করেছে এবং পাকিস্তান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হাজার হাজার আফগান শরণার্থীকে সহায়তা প্রদান করেছে।

আফগানিস্তানে ভারতের শেষ পরিণতি কী?

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রাঘব শর্মা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত তাদের বার্তা দিতে চায়, উন্মুক্ত দৌড় দিও না। পাকিস্তান ও তার মিত্র চীন উভয়ের সঙ্গেই আফগানিস্তানের স্বার্থের ভিন্নতা রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থও রয়েছে, যার জন্য তালেবানের সঙ্গে সম্পৃক্ততাই একমাত্র বিকল্প।

সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েত বলেন, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্কের নিজস্ব গতিশীলতা থাকলেও বর্তমানের তালেবান নেতৃত্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে অস্বীকার করে। তাই পাকিস্তান পাকিস্তানি তালেবানের কর্মকাণ্ডে ভারতের জড়িত থাকার অভিযোগ করে। তালেবানরা অবশ্য ভারতের উদ্দেশ্য, নীতি এবং মানবিক অবদান বোঝে ও প্রশংসা করে। এতে তালেবান নেতারা নয়াদিল্লির সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

/ টিটি

সর্বশেষ - লাইফস্টাইল